ছেঁউড়িয়ায় রবিবার থেকে লালন স্মরণ উৎসব শুরু

26
Spread the love

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

লৌকিক বাংলার কিংবদন্তি সাধক বাউল স¤্রাট ফকির লালন শাহের ‘দোল পূর্ণিমা’ উৎসব বা ‘স্মরণোৎসব’ আজ। এ উপলক্ষে রবিবার থেকে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে তিনদিনব্যাপী বাউল সমাবেশ। সন্ধ্যালগ্নে ‘রাখল সেবা’র মধ্য দিয়ে শুরু হবে সাধুদের দেড় দিনের মূল উৎসব। চলবে সোমবার বিকেলে ‘অষ্টপ্রহর সাধুসংঘ’ বা ‘পুণ্যসেবা’ গ্রহণ পর্যন্ত। এদিকে দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে লালনের আঁখড়াবাড়ি চত্বর এখন উৎসব মুখর। দেশ-বিদেশ থেকে আগমন ঘটছে লালনভক্ত, বাউল অনুসারী ও সুধীজনসহ অসংখ্য মানুষের। রাতভর চলবে লালনের স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা আর গান। বসছে জমজমাট লোকশিল্প মেলা। বাংলার বাউল সঙ্গীতের ক্ষেত্রে মরমী সাধক লালনের নাম আজ স্মরণীয়। লালনের গানে কেবল আধ্যাত্ম দর্শনই নয়, বাংলার সমাজ, প্রকৃতি ও মানুষের কথাও প্রতিফলিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, লালন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন বাঙালী। যিনি ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন শাহ ইত্যাদি নামেও পরিচিত। তিনি একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক পুরুষ, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক এবং মানবতাবাদী সাধক। যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে দিয়েছেন সর্বোচ্চ স্থান। অসাম্প্রদায়িক এই মনোভাব থেকেই তিনি তার গান রচনা করে গেছেন। অসংখ্য মরমী গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক তিনি। লালনের জন্ম, জাত ও ধর্ম নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। লালন নিজেও তার জাত-ধর্ম সম্পর্কে নিস্পৃহ ও উদাসীন ছিলেন। তার জাত ও ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি নিজেই জবাব দিয়েছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে। লালন বলে জাতের কি রূপ, দেখলাম না এই নজরে। কেউ মালায় কেউ তসবি গলায়, তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়। যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়, জাতের চিহ্ন রয় কার রে। যদি সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কি হয় বিধান?…। লালন কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানবতাবাদে বিশ্বাসী। কিন্তু সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গেই তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে আজ সন্ধ্যায় তিনদিনব্যাপী এ স্মরণোৎসবের উদ্বোধন করবেন প্রধান অতিথি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি। অনুষ্ঠানে অতিথি থাকছেন আঃ কাঃ মঃ সরওয়ার জাহান এমপি, সেলিম আলতাফ জর্জ এমপি, কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত প্রমুখ। লালন একাডেমির অনুষ্ঠান তিনদিনের হলেও সাধুদের মূল উৎসব দেড় দিনের। সন্ধ্যায় ‘রাখল সেবা’ (মুড়ি, চিড়া, খাগড়াই মিশিয়ে দেয়া খাবার) গ্রহণের মধ্য দিয়ে তা শুরু হবে এবং শেষ হবে সোমবার বিকেলে ‘অষ্টপ্রহর সাধুসংঘ’ বা ‘পূর্ণ সেবা’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। দোল উৎসব উপলক্ষে লালনের সাধন-ভজনের তীর্থস্থান ছেঁউড়িয়ার আঁখড়াবাড়ি চত্বর এখন উৎসবের পল্লী। দেশ-বিদেশ থেকে আগমন ঘটছে লালনভক্ত, বাউল অনুসারী ও সুধীজনসহ অসংখ্য মানুষের। প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকছে স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা ও গান। এছাড়া বসছে জমজমাট লোকশিল্প মেলা। বাউল ফকির বলাই শাহ বলেন, সাধু-গুরু তাদের সেবাদাসী এবং ভক্ত ও অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে প্রথমদিন দোল পূর্ণিমার সন্ধ্যার আগেই লালনের আঁখড়াবাড়িতে নিজ নিজ আসনে বসবেন। ‘আসনে’ বসা সাধু-গুরুদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভক্তি-শ্রদ্ধার বিষয়। যার যেমন সামর্থ্য, কেউ সাদা বা রঙিন কাপড়ের টুকরোর ওপর, কিংবা শিতল পাতার মাদুর, এমনকি গামছা বিছিয়েও আসনে বসতে পারেন। ২৪ ঘণ্টায় সাধুদের সেবা মোট ৪টি। রাখাল সেবা, অধিবাসর সেবা, বাল্যসেবা এবং পুণ্যসেবা। বলাই শাহ বলেন, সন্ধ্যা লগ্নে রাখাল সেবা গ্রহণের পর থেকে ২৪ ঘণ্টার অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গের (তিন ঘণ্টায় এক প্রহর) আগ পর্যন্ত সাধু-গুরু তাদের ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে ধ্যানে বসে তবজব করেন। এসময় তারা একই স্থানে বসে উপাসনা, সাধনা-আরাধনা করতে থাকেন। পরদিন সোমবার অনুষ্ঠিত হবে বাউলদের ‘অষ্টপ্রহরের সাধুসংঘ’। এদিন ভোরে গোষ্ঠী গানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বাউলদের দ্বিতীয় দিনের আচার অনুষ্ঠান। এরপর একে একে অনুষ্ঠিত হয় অন্যান্য কার্যক্রম। গুরু-শিষ্যের ভাব আদান-প্রদান, লালন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা, আর সে সঙ্গে চলে নিজস্ব ঘরনায় বসে লালনের গান পরিবেশন। পুণ্যসেবায় সাধুদের খেতে দেয়া হয় মাছ, ভাত, সবজি বা ঘন্ট, ডাল আর দই। এই আহারকে বলে পুণ্য সেবা। এই সেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বাউলদের ‘অষ্টপ্রহরের সাধুসংঘ’ এবং ভেঙ্গে যায় বাউলদের আসর। লালন জীবিতকালে প্রতিবছর দোল পূর্ণিমার রাতে লালন শাহ নিজেই ভক্ত শিষ্যদের নিয়ে উৎসবটি পালন করতেন। সেই থেকে লালনের ভক্ত ও অনুসারীরা আজও দিনটিকে পালন করে আসছে। কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত জানান, উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য। লালনের জীবন-কাহিনী অনেকাংশেই রহস্যাবৃত। তাঁর মৃত্যুর পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত অমর কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত পাক্ষিক ‘হিতকরী পত্রিকা’র সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, ‘ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশত কিছুই বলিতে পারে না। তথাপি কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যতিরেকেই একটি সূত্রে তাকে হিন্দু কায়স্থ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও লালন হিন্দু না মুসলমান এই কৌতূহল ও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে জীবদ্দশায়। কিছু সূত্রে জানা যায়, লালনের প্রিয়জনেরা তাকে ডাকত ‘নালন’ নামে। নাল অর্থ উর্বর কৃষিজমি। লালনের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়’। ‘হিতকরী পত্রিকা’র ওই নিবন্ধ মতে, ‘লালন যৌবনকালে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন সাথীরা তাকে পরিত্যাগ করে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করে

তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রƒষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন মলম শাহ ও স্ত্রী মতিজান’। লালন ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। শৈশবে পিতৃ বিয়োগ হওয়ায় অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার ওপর। আর্থিক সঙ্কট, সাংসারিক চিন্তা ও আত্মীয়বর্গের বৈরিতা তাকে বিশেষ পীড়িত করে তোলে। এক পর্যায়ে লালন সমাজ ও স্বজন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে ব্যথিত ও অভিমানে চিরতরে গৃহত্যাগ করেন। পরে তিনি সিরাজ সাঁই নামের এক তত্ত্বজ্ঞসিদ্ধ বাউল গুরুর সান্নিধ্যে এসে বাউল মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর গুরুর নির্দেশে লালন কুষ্টিয়া শহরের কালীগঙ্গা নদীর তীরে ছেঁউড়িয়া গ্রামে এসে বাংলা ১৮২৩ সাল মতান্তরে ১৮৩০ সাল নাগাদ আঁখড়া স্থাপন করেন। অল্প দিনের মধ্যেই লালনের প্রভাব ও পরিচিতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। জীবদ্দশায় লালনের একটি স্কেচ তৈরি করেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তার বোটে বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন। যা ভারতীয় জাদুঘরের সংরক্ষিত রয়েছে। যদিও কেউ কেউ দাবি করেন, স্কেচটিতে লালনের আসল চেহারা ফুটে ওঠেনি। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (বাংলা ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক) শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় ১১৬ বছর বয়সে লালন শাহ দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শিষ্য-ভক্ত পরিবেষ্টিত থেকে গানবাজনা করেন। এরপর ভক্ত-শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি চলিলাম’। লালনের ইচ্ছা না থাকায় তার মৃত্যুর পর হিন্দু বা মুসলমান কোন ধর্মীয় রীতিই পালন করা হয়নি। তারই ইচ্ছে অনুসারে আখড়ার একটি ঘরের ভেতর তাকে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুর ১২ দিন পর হিতকরী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে ‘মহাত্মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। লালন আজ নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অমর সৃষ্টি। যার মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন বাঙালীর মরমী মানসপটে।