রূপসা ও ভৈরব তীর ঘিরে কেসিসির মহাপরিকল্পনা: অবৈধ দখলদাররা আতংকে

0
43

সেপ্টেম্বরে পরিদর্শনে আসছেন জার্মানী প্রতিনিধি দল

হারুন-অর-রশীদ
নদী শাসন ও নগরায়নকে এক সূতায় বাঁধতে চাইছে সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় খুলনার রূপসা ও ভৈরব নদকে ঘিরে রয়েছে সরকারের মহাপরিকল্পনা। রূপসা ঘাট থেকে শুরু করে ৬নং ঘাট পর্যন্ত জার্মান উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ‘নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প’ সিআরডিপি নামক প্রকল্পে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এ কাজ বাস্তবায়ন করবে। এ প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনের জন্য আগামী সেপ্টেম্বরে খুলনায় আসছেন জার্মানী প্রতিনিধি দল। সরকারের এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে খুলনার মানুষ চিত্ত বিনোদনের সুযোগ পাবে। নদীর পাড় টেকসই ভাবে বাঁধানো ও দূষণ মুক্তরাখা সম্ভব হবে। এ মহাপরিকল্পনায় দেশের কল্যাণ বয়ে আনবে। খুলনার বড় বাজারসহ ভৈরব ও রূপসার তীর ঘেষে গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বড় বড় ভবন। অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকার ব্যবসা নদীতে। ভৈরব ও রূপসা নদ দখল করে চলছে ব্যবসা। নতুন বাজার এলাকায় রয়েছে একটি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। যার কোন বৈধ কাগজপত্র নেই। পূূর্ব রূপসায় গড়ে উঠছে একাধিক (মাছ কোম্পানি) মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা যার কোন লাইসেন্স নেই। এ কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০০৭-০৮ সাল থেকে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাইসেন্স ফি নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে বিআইডবিøউটিএ। পানির মধ্যে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কতিপয় ব্যবসায়ী। এ ধরণের খুলনার সহস্্রাধিক ব্যবসায়ী উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছেন।
সূত্র জানিয়েছেন ১৯৯৭-৯৮অর্থ বছরে বিআইডবিøউটিএ ঘাট হতে জেলখানা ঘাট পর্যন্ত ১ হাজার ২১৫ মিটার শহররক্ষা বাঁধ, নির্মিত ড্রেন পরিচালনা ও রক্ষণা বেক্ষন করার জন্য ১০লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। জিও টেক্সটাইল ও কংক্রিটের বøক দিয়ে শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ১৯৬৬ সালের বন্দর আইনের ৫৪ ও ৫৫ ধারা মতে বিআইডবিøউটিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১৯৭৬ সালে লাইসেন্স গ্রহণ করে নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে পাইল দিয়ে নদী তীর সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সেকেÐারী টাউন্স ইন্টিগেশন ফ্লাড প্রটেকশন প্রজেক্ট’র আওতায় জিও টেক্সটাইল ব্যবহার করে ও কংক্রিটের বøক দিয়ে শহররক্ষ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ব্যবসায়ীরা অবৈধ দখলদার নয়। অনেকে মালিকানা সম্পত্তি হারিয়ে তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাবেক খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান ২০১৭ সালে নদী বা ফোরশোর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য নোটিশ প্রদান কররেলও তা হঠাৎ থমকে যায়।
ডেলটা ঘাটের ব্যবসায়ী ইন্তাজ বানিজ্য ভান্ডারের সত্বাধিকারী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী বান্ধব। ব্যবসায়ীরা উন্নয়নের অংশীদার। উচ্ছেদ করলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে পথে বসতে হবে। তাদের দিক বিবেচনা করে সিটি কর্পোরেশন উন্নয়নের কাজ করবে এটাই আমাদের দাবী।
নিশাত বাণিজ্য ভান্ডারের সত্বাধিকারী মো. সুজন হাওলাদার বলেন, আমরাও চাই নদীর পিছন দিক থেকে যদি রাস্তা হয় তা হলে ব্যবসায়ীরা নিরাপদে থাকবে। তবে ব্যবসায়ীরা যাতে কোন হয়রানি বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
কংস বাণিজ্য ভান্ডারের সত্বাধিকারী দিপু বনিক বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের সামান্য কিছু অংশ নদীর মধ্যে রয়েছে। ভেঙ্গে দিলেও কোন সমস্যা হবে না।
বিআইডবিøউটিএ সূত্র জানায়, ২৫টি মৌজার মধ্যে গত বছর থেকে শুরু করে রূপসা ঘাট থেকে ৬নং মাছ ঘাট পর্যন্ত বানিয়াখামার, হেলাতলা, টুটপাড়া ও লবণচড়া পর্যন্ত ৪টি মৌজার জরিপ কাজ গত ৯মে শেষ করে। বাকি ২১টি মৌজা রূপসা, বটিয়াঘাটা ও দিঘলিয়া উপজেলায়। তারও জরিপ কাজ সমাপ্ত করা হবে। সদ্য সমাপ্ত হওয়া হওয়া ৪টি মৌজায় ১১৫৪ স্থাপনা চি‎িহ্নত করা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে প্রভাবশালীদের স্থাপনা, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাড়িঘর,ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও সরকারি প্রতিষ্ঠান। উচ্চ আদালতের নির্দেশে সিএস ম্যাপ অনুয়ায়ী জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, নদীর পাড়ে যাদের স্থাপনা রয়েছে তাদের নোটিশ করা হবে। স্ব স্ব কাগজ পত্র ও তাদের প্রমাণাদি নিয়ে হাজির হবেন। সেগুলো যাছাই বাছাই হবে। সরকারি জায়গা এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল দখল করে রয়েছে। উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাতে অর্থ ও জনবল প্রয়োজন।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, রূপসা ও ভৈরব নদের তীরে শহর রক্ষা বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ করবে। জার্মান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের আর্থিক সহয়তায় নির্মাণ করা হবে সিআরডিপি’র ‘নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প’। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানী প্রতিনিধি দল সরেজমিনে পরিদর্শনে আসবেন। কতিপয় প্রভাবশালী মহল দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে দখল করে রেখেছে। সেগুলো উচ্ছেদ করতে একটু সমস্যা হতে পারে। সব ঠিক থাকলে টেন্ডার আহবান করা হবে। তার পর দাতা সংস্থা অর্থায়ন করবে।
খুলনা অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডবিøউটিএ)’র উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চি‎িহ্নত স্থাপনাগুলোর মধ্যে ৭০টির লাইসেন্স রয়েছে। বাকিদের কোন লাইসেন্স নেই। তারা অবৈধভাবে দখল করে রয়েছে। উচ্ছেদের জন্য যে প্রক্রিয়া প্রয়োজন তা চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে বিআইডবিøউটির ভূমি ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশের লাইসেন্স নেই। যা অবৈধভাবে যুগ যুগ ধরে ভোগ দখল করে আসছেন।
জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী হারুন-অর-রশীদ বলেন, ৪টি মৌজার জরিপ শেষ হয়েছে। আরো ২১টি মৌজা জারপ করা হবে। রূপসা ও ভৈরব নদীর ওই পাড়ের ৪টি উপজেলায় রয়েছে ২১টি মৌজা। রূপসা ও ভৈরব নদের তীর ঘেষে গড়ে ওঠা খুলনা বড় বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদ করতে বাঁধা আসতে পারে। প্রভাবশালী মহল দখল করে রেখেছে। তবে নদীকে ঘিরে সরকার বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। উচ্ছেদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার বলেন, বৈধ ও অবৈধ স্থাপনা যাছাই বাছাই হচ্ছে। প্রভাবশালীদের কিছু অবকাঠামো রয়েছে। এগুলো উচ্ছেদ কঠিন হয়ে পড়বে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জার্মানীর একটি প্রতিনিধি দল পরিদর্শন করবেন। সব ঠিক থাকলে টেন্ডার আহবান করা হবে। জার্মান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এ কাজ বাস্তবায়ন করবে সিটি কর্পোরেশন। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনাসহ দূরদুরন্ত আসা লোকজন নদীর দৃশ্য অবলোকন করতে পারবেন ও চিত্ত বিনোদনের সুযোগ পাবেন। এখানে থাকবে বসার স্থান, নানা রকমের ফুল, ফল, শোভাবর্ধণকারী গাছ, রাস্তা ও ফুটপাত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here