ভাল থাক নুসরাত, আমরা ভালো আছি

0
24

কৌশিক দে
প্রকৃতি স্বাভাবিক; স্বাভাবিক নিয়মেই এগিয়ে চলে। আমরা এই এগিয়ে চলা সময়ের যাত্রী মাত্র। তাই বছর ঘুরে আবারও এসেছে পহেলা বৈশাখ। বাঙালীর সার্বজনিন উৎসব বাংলা নববর্ষ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব এটি। কিন্তু এবারের পহেলা বৈশাখ কষ্টগাঁথা বেদনায় কিছুটা হলেও মলিন হচ্ছে। থাকছে হাহাকারও। বৈশাখের আগে ‘লালসা’ নামক কালোবৈশাখীর আগুন ঝড়ে উড়ে যাওয়া মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হৃদয়ে এক ক্ষতচি‎হ্ন এঁকে দিয়েছে। এই ক্ষত নিয়েই এবার নববর্ষের উৎসবে সামিল হবে মানুষ। তাই এবারের বৈশাখ অন্যরকম এক নববর্ষ। এই নববর্ষ হতে হবে প্রতিবাদের, প্রতিরোধের। পুরোনো জঞ্জাল বিদায় করে নতুনভাবে বেঁচে থাকার নতুন একটি বছর।
সত্যিই আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকবো। পঁচা-গলা সমাজ আমাদের কুড়ে কুড়ে মারবে। আর আমরা মৃত্যু শয্যায় বসে অট্টহাসি হাসবো; আমরা বেঁচে আছি, বেঁচে থাকবো। মনে পড়ে, ২০১৬ সালে (২০ মার্চ রাতে মৃতদেহ উদ্ধার) কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যার পর কোন এক লেখায় লিখেছিলাম, ‘আমরা সবকিছু ভুলে যাই, ভুলে যাওয়া ভাল’। আসলেই ভুলে থাকাই ভাল। আমি বা আপনি বা আমরা আমাদের কষ্টগাঁথাগুলো ভুলে থাকলে ভাল থাকবো। চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে, আমরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগবো না। ভাল ঘুম হবে। মাথার মধ্যে থাকা স্মৃতিস্তরে জট বাঁধবে না। তাই গত তিন বছরে আমরা তনুকে ভুলে যেতে পেরেছি। আমাদের সহকর্মী সাংবাদিক সাগর-রুনির কথা এই মুহূর্তে মনেই পড়ছে না। আরও কত কী। তাই অগ্নি সন্ত্রাসের শিকার নুসরাত জাহান রাফির ক্ষেত্রে এমনটা ঘটনার আশঙ্কা আমাদের মন থেকে মুছে ফেলতে পারবো না।
মাঝে মাঝে চল্লিশ দশকের বয়সটুকু আমার কাছে দীর্ঘ সময় মনে হয়। এই সময়ে কতকিছুই না দেখে ফেললাম। আমরা মান্ধতার আমল পেরিয়ে আজ প্রযুক্তির যুগে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি গোটা বিশ্বকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। বেড়েছে জীবনযাত্রার মান, অর্থের প্রাচুর্য্য। আর তার বিপরীতে কমেছে মানবতা, সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ, ধর্য্য, সহিষ্ণুতা ও সত্যিকার অর্থে ভালবাসা।
কিশোর বেলায় পড়া কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কয়েকটি চরণ এখনো হৃদয়ে স্থান করে আছে। কবিতায় কবি বাদশা আলমগীরের পুত্রের শিক্ষাগুরুর মর্যাদার বিষয়টি সেখানে উল্লেখ করেছিলেন। কবি লিখেছিলেন, বাদশা আলমগীরের ছেলেকে দিল্লীর এক মৌলভী পড়াতেন। একদিন বাদশা দেখলেন ওই মৌলভীর পায়ে তার পুত্র পানি ঢালছে আর মৌলভী নিজের হাত দিয়ে পা পরিস্কার করছেন। এ দৃশ্য দেখে বাদশা মৌলভীকে তাঁর অন্দরমহলে ডেকে পাঠান। এতে প্রথমে মৌলভী ভয় পেয়ে যান। কিন্তু পরবর্তীতে তিনিই মনে মনে বলে উঠেন, ‘আমি ভয় করি নাক, যায় যাবে শির টুটি/শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার/ দিল্লীর পতি সে তো কোন ছাড়।’ অবশ্য সেদিন বাদশা আলমগীরই শিক্ষকের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কেন তার পুত্র শুধু গুরুর চরণে পানি ঢেলেছে? সে কেন নিজ হাতে গুরুর পা পরিস্কার করে দেয়নি। তার পুত্র কোন শিক্ষা পাইনি বলেও কপট রাগ করেছিলেন বাদশা। আর শতাব্দী পড়ে এ বাস্তবতা অনেকটা বিপরীত অবস্থা ধারণ করছে।
ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (বরখাস্ত) সিরাজ উদ্দৌলার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার ওই বিপরীত চিত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে আমাদের সামনে এসেছে। নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা এর আগে তাকে যৌন নিপীড়ন করে বলে অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অধ্যক্ষকে গ্রেফতারের পর মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যান। মানুষ কত ভয়ঙ্কর হলে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে এটিও তার অন্যতম উদাহরণ। আর অপরাধের অন্যতম সমর্থক আমাদের টাকায় চলা স্থানীয় থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি শুধু অধ্যক্ষকে রক্ষা করেই ক্ষান্ত হতে চাননি। বরং ঘটনাকে একটি নাটক বানাতে চেয়েছিলেন। ইতিমধ্যে এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই)। যে তথ্যে ঘটনার জন্য মূল অভিযুক্ত সিরাজ উদ্দৌলা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হয়। তিনি এ ঘটনায় দ্রæত নজর দিয়েছেন। আজ রাফিকে বাঁচানো না গেলেও প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের আন্তরিকতার অভাব দেখছি না। আর এ কারণেই অপরাধীরা সনাক্ত ও গ্রেপ্তার হচ্ছে। আমি বা আমরা বিশ্বাস করি, অন্যান্য ঘটনার মতো হয়তো আমাদের এ ঘটনা ভুলতে হবে না। অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক সাজা পাবে। আগামীদিনে এমন ঘটনার আর পুনার্বৃত্তি ঘটবে না।
আমি আগেই বলেছি, এবারের বাংলা নববর্ষ হোক প্রতিবাদের-প্রতিরোধের। এ প্রতিরোধ হতে হবে সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে। এই অপশক্তি শুধু সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকা, জঙ্গিবাদ বা মৌলবাদ নয়। এ অপশক্তি সামাজিক অবক্ষয়, অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। রাফির হত্যাকারী সিরাজ উদ্দৌলার সংখ্যা সমাজে খুব বেশী নয়, কিন্তু এ সিরাজ উদ্দৌলারা সমাজের ক্যানসার। এ ক্যানসার সমূলে উৎপাটন করতে হবে। এবারের নববর্ষ হোক এই অপশক্তির বিরুদ্ধে। যেখানেই থাক ভাল থাক নুসরাত জাহান রাফি, আমরা ভাল থাকবো। সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।
লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ
(ফেসবুক টাইম লাইনে প্রকাশিত হলে দৈনিক খুলনাঞ্চলের ‘কানামাছি’র পাঠকের জন্য পুনরায় প্রকাশ করা হল)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here