বাংলা নববর্ষ : সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের জয়গান

0
43

॥ প্রবীর বিশ্বাস ॥

বাংলা নববর্ষে নানা রঙে, নানা পোশাকে বর্ণময় হয়ে ওঠে বাঙালি। কেননা বাঙালির একটি সার্বজনীন উৎসব এটি। স¤্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা নববর্ষের সূচনা। মোগল সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ হুমায়ূনের মৃত্যুর পর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই রাজ্যের শাসনভার নেন জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর। তখনকার দিনে কৃষকদের খাজনা চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী দিতে হতো। কিন্তু চান্দ্রবর্ষ প্রতিবছর ১১ দিন করে এগিয়ে যেতো যা কৃষকের খাজনা দেয়া ও ফসল তোলার মধ্যে সমস্যা তৈরি করতো। তাই বাদশাহ আকবর তার শাসনামলের শুরু থেকেই সহজ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কার্যকর পদ্ধতিতে বছরের হিসাব রাখার কথা ভাবছিলেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার দায়িত্ব পড়ে সে সময়ের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোর্তিবিদ আমির ফতল্লাহ শিরাজীর ওপর। তার প্রচেষ্টায় ১৫৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১০ কি ১১ মার্চ স¤্রাট আকবর ‘ইলাহী সন’ নামে নতুন এক সন চালু হয়। সে সময়ের কৃষকশ্রেণীর কাছে এটি ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত হয়। যা পরে ‘বঙ্গাব্দ’ নামেই পরিচিতি পায়। নতুন এই সালটি আকবরের রাজত্বের ২৯তম বর্ষে চালু হলেও তা গণনা আরম্ভ হয় ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। কারণ ওই দিনেই দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে তিনি হিমুকে পরাজিত করেছিলেন।

আজকের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে নানা অনুষ্ঠান আমরা দেখতে পাই বাঙালির আবহমানকালের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা চলছে। পহেলা বৈশাখের কলেবর কোথাও কমছে না। বরং প্রবাসী বাঙালির মধ্যে এর ক্রমাগত বিস্তৃতি ল করার মতো। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলোতে যেখানে ৫০টি বাঙালি পরিবার আছে, সেখানেও সাড়ম্বরে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হচ্ছে। পয়েলা বৈশাখে গ্রামীণ মেলা একটি বড় বিষয়। সেখানে যাওয়ার জন্য সব বয়সের মানুষরই আগ্রহ থাকে। এসব মেলায় পাওয়া যায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারূপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব ধরণের হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পজাত, মানে মাটির সামগ্রী। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মেয়েদের সাজসজ্জার সামগ্রীসহ আরো কতো কিছু পাওয়া যায় এই মেলায়। রকমারি লোকজ খাদ্যসামগ্রী, যেমন, চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা ও বিভিন্ন প্রকার মিষ্টির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়।

শুধুু খাওয়া দাওয়াই নয়, এসব মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগীতি ও লোকনৃত্য পরিবেশন করা হয়। সেখানে পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গান, পটগান ও যাত্রাপালার হয়ে থাকে। কবিগানের মধ্য দিয়ে মানুষের মূল্যবোধের বিকাশ হয়; পাপ-পুণ্য সম্পর্কে ধারণা, মূল্যবোধ সম্পর্কিত উপলব্ধি এসব জনমানুষের চিন্তার গভীরে প্রবেশ করে। যাত্রাগানে মানুষের সুকুমার বৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তিকে তুলে ধরা হয়। বিবেকের গান মানুষের বিবেককে জাগ্রত করত। কোথাও কোথাও পথনাট্য উৎসবও হয়ে থাকে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুল নাচ, নাগর দোলা, সার্কাস বৈশাখী মেলার বিশেষ আকর্ষণ। শিশু-কিশোরদের জন্য আরো থাকে বায়োস্কোপ। এছাড়া থাকে পিঠা, হাওয়াই মিঠা, তালপাখা, বাঁশ ও তালপাতার বাঁশি, বেলুন, ঘুড়ি, কাঁচের চুড়ি, ফিতা, দুল, শীতল পাটি, বাঁশের ঝুড়, সাজি, ঢোল, নাটাই, আইসক্রিম, মৌসুমী ফল, শুকনো মিষ্টি নিয়ে বসে অনেক বিক্রেতা। কোনো কোনো এলাকায় পহেলা বৈশাখে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

আমাদের দেশের আদিবাসীরাও পালাপার্বণের উৎসবে পহেলা বৈশাখ জায়গা করে নিয়েছে। চাকমাদের বিজু উৎসব পহেলা বৈশাখের আগের দিন। যারা খাঁটি বাঙালি তারা এ উৎসবের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায় এবং তাদের আনন্দে শরিক হয়। তেমনি সমতলের আদিবাসীদের নানা উৎসবে বাঙালিরা শরিক হচ্ছে এবং অন্য জাতিসত্তাকে শ্রদ্ধা দেখানো খাঁটি বাঙালির গুরু দায়িত্বের মধ্যে এসে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙ্গালি হও- এ বাণী বাঙালির শাশ্বত বাণী। আবার নজরুল বলেছেন, ‘হিন্দু মুসলিম জিজ্ঞাসে কোনজন, কান্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার’। এ দুজন খাঁটি বাঙালি সাস্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠে মানুষের জয়গান গেয়েছেন। আমাদের জাতীয়তার প্রশ্নটি নিয়েও কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই।

আমরা প্রথমত বাঙালি ও বাংলাদেশের নাগরিক। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, বাঙালি ছাড়াও এ দেশে ৪৫টি জাতিসত্ত্বা এবং ৪০টির বেশি ভাষা রয়েছে। এ জাতিসত্ত্বাগুলোকে এবং তাদের ভাষার প্রতি সম্মানের মধ্য দিয়ে খাঁটি বাঙালিত্বের প্রমাণ। প্রতিটি পহেলা বৈশাখে আমরা বাঙালির নবতম ভাবনাকে নতুন করে স্মরণ করব। বৈশাখের যে লৌকিকতা তা শুরু হয় পরিবার থেকে। আত্মীয়, বন্ধু, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবেশীসহ প্রিয়জনদের শুভেচ্ছা জানানো ও কুশল বিনিময় চলে ছোট-বড়দের মধ্যে।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসবের দিন। বাংলা বছরকে অভিবাদন জানানোর দিন। এদিন গোটা বাঙালি আলোড়িত হয়, আন্দোলিত হয়। মানুষ স্বভাবতই উৎসব প্রিয়। নিত্য যাপিত জীবনে একগুয়েমি পরিহার করে মানুষ নতুনত্বে শামিল হতে চায়। নতুন মানে সবার কাছে নতুন আনন্দ। তাই পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন দিন, নতুন বছর। নতুন বছরের প্রথম দিনে আমাদের চিত্ত বিনোদনে পাশের লোকটির মুখ যেনো মলিন না থাকে, আসুন আমরা সেদিকেও দৃষ্টি রাখি। পহেলা বৈশাখ যেনো আভিজাত্যের মধ্যে আটকে না থাকে। সার্বজনীন উৎসবের সার্থকতা এখানেই নিহিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here