প্রসঙ্গ : প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা

0
106

মো. রিপন মোল্যা
বেলা দশটা। কোন ছুটির দিন নয়। একটি রেঁস্তোরায় খেতে বসেছি এমন সময় আট দশ বছরের একটি ছেলে এক গøাস পানি দিয়ে গেল। সকলে তাকে পিচ্চি বলে ডাকছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তোমার নাম কি? সে বলল, আকবর। আমি তাকে বললাম, তুমি স্কুলে যাও? সে বলল না, আমার বাবা নেই মাও অসুস্থ। আমি এখান থেকে যা উর্পাজন করি তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। তাই আমি পড়াশুনা করতে পারি না। দেশের আঁনাচে-কানাচে এ রকম অসংখ্য আকবর রয়েছে যাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা বিদ্যালয়ে না গিয়ে বিভিন্ন কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসা বাড়ি ও টোকাই এর কাজ করছে। যে সময় ও বয়সে লেখাপড়া করার কথা সে সময় ও বয়সে তারা বিভিন্ন পন্থায় উপার্জনে ব্যস্ত। শ্রম আইন অনুযায়ী শিশুশ্রম অরারাধমূলক কাজ হলেও অনেক কলকারখানায় শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায়।
মৌলিক অধিকার সমূহের মধ্যে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা অন্যতম। অর্থাৎ পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষার স্থান পঞ্চম। তাই শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে পূর্বের চারটি অধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরী।
আমরা সকলেই জানি, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, উন্নতির মূল চাবিকাঠি বা সোপান। আর শিক্ষার মূলভিত্তি হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা। শিশুর নৈতিক, মানসিক ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের ভিত্তি হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার সময়কাল। এ সময়ে শিশুর অন্তর্নিহিত অপার বিস্ময়বোধ অসীম কৌতহল আনন্দবোধ ও অফুরন্ত উদ্যম শিশুর দৈহিক মানসিক ও প্রতিভাবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময়ে শিশু যেভাবে গড়ে উঠে সেই ভাবেই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। তাই প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। এ লক্ষ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান অব্যহত রয়েছে। এছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। ভৌত অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে কিন্তুু তার সত্তে¡ও শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যে সকল শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছানোর পূর্বেই একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঝড়ে পড়ছে। শতভাগ শিশুরা কেন বিদ্যালয়ের যাচ্ছে না এবং কেন মাধ্যমিক স্তরের পৌাঁছানোর পূর্বেই ঝড়ে পড়ছে সে সম্পর্কে সরকারের সম্মুখ ধারণা এবং সে মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী।
বাংলাদেশের শিক্ষানীতি উপনৈবেশিক ধাঁচে গড়া কুদরাত-ই-খুদা কমিশন থেকে শুরু করে এ যাবৎকাল পর্যন্ত যতগুলো শিক্ষানীতি প্রনয়ণ করা হয়েছে। তার কোনটিই যথাযথা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শিক্ষা বিস্তারের কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। শিক্ষার উন্নয়নের জন্য যুগোউপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তুু প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূর হচ্ছে কি? সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষার মান একরকম, এনজিওভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষার মান আরেকরকম। আবার কিংন্ডার গাডেন (বাংলা ও ইংরেজী মাধ্যম) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার মান অন্যরকমভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এনজিওভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে নামমাত্র পাঠদান করা হচ্ছে। যা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের থেকে ভিন্ন। আবার কিংন্ডার গাডেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহে শিক্ষার্থীরা ভিন্ন আঙ্গিকে গড়ে উঠছে। ফলে বৈষম্যর শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ বৈষম্য দূর করতে না পারলে শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হওয়া দুরূহ।

এ শিক্ষানীতিতে সকল বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান ও গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীর সূরক্ষার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। শুধু বিদ্যালয়ে নয় তার বাইরেও শিক্ষার্থীদের সূরক্ষার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরী। শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘেœ বিদ্যালয়ে যেতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্কুল ফিডিং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে সহায়ক ভুমিকা রাখে। তাই শিক্ষানীতিতে পিছিয়ে পড়া এলাকার গ্রামীণ সকল বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা পর্যাযক্রমে চালুর প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমটি অত্যন্ত ব্যয় বহুল তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বৃত্তবানদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের দুনীর্তি, মাদক ও সন্ত্রাসবাদের কুফল সর্ম্পকে বিস্তারিত ধারণা দিয়ে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। অনেক সময় শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টারে পড়তে দেখা যায়। বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে পাঠদান করা হলে প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা অনুভুত হতো না। কাজেই বিদ্যালয়ে সঠিকভাবে পাঠদান করার জন্য শিক্ষকদের আরো যতœবান হতে হবে এবং আন্তরিকতার সাথে পাঠদান করতে হবে। এ লক্ষে শিক্ষকদের আকর্ষণীয় শিক্ষন-পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। শিক্ষা খাতে দুনীতি কমতে হবে বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। সকল শিশুরা যাতে বিদ্যালয়ের যায় সে লক্ষে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আধিবাসী ও প্রতিবদ্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রান্তিক ছিন্নমূল অধিকারবঞ্চিত পথ শিশুদের অবশ্যই শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে শিক্ষার ব্যবস্থার গোড়ায় গলদ থেকে যাবে। এ জন্য সরকারকে এ সকল শিশুদের তালিকা প্রস্তুত করে অনতিবিলম্বে শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। নচেৎ শিক্ষার ব্যবস্থার সার্বিক মঙ্গল মারাত্মকভাবে বিঘিœত হবে।

লেখক: দৌলতপুর প্রতিনিধি, দৈনিক খুলনাঞ্চল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here