সাগর কন্যা কুয়াকাটা : সম্ভাবনার দরজায় সিন্ডিকেটের কালো ছায়া

0
79

কৌশিক দে
ব্যস্ততা জীবনের অংশ। শিশু থেকে কিশোর-কিশোরী, যৌবন অতিক্রম করে মধ্য ও বৃদ্ধ বয়স। তারপর জীবনের পরিসমাপ্তি। তাই মানুষ জীবন উপভোগ করে। মানুষ ছুটে চলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। এ ছুটে চলায় যেমন আনন্দ আছে, তেমনি আছে শিক্ষারও। আমাদের এক দেশের মানুষের মধ্যেও রয়েছে হাজারও ভিন্নতা। দেখতে পাই বৈচিত্রময় পার্থক্যও। এসব দর্শনকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও খুলনা প্রেসকাব দেশ সফর ও বনভোজনের আয়োজন করে। আমাদের এবারের গন্তব্য ছিল ‘সাগর কন্যা কুয়াকাটা’। গত ১৪-১৬মার্চ পর্যন্ত আমাদের এ সফরে সংযুক্ত হয়েছিলেন কাবের স্থায়ী ৩৪জনসহ মোট ৯৫জন সদস্য।
প্রবাদ আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে’। আমাদের সাংবাদিকদের অবস্থা এ প্রবাদের বাইরে নয়। কিছু দেখতে না চাইলে কেন যেন সবকিছু চোখের সামনে এসে পড়ে। এবারের সাগর কন্যা কুয়াকাটা দর্শনে তার ব্যতিক্রম হয়নি। গেল বছর আমরা দেশসফরে গিয়েছিলাম সমুদ্রের লীলভূমি কক্সবাজারে। একটি বছর পরও সেই সফরের স্মৃতি ও ছোঁয়া যেন এখনও লেগে আছে। এ অবস্থায় আবারও সাগর দর্শন চোখের সামনে যেন নতুন নতুন দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি সব সময়ই আশাবাদী। তাই যাত্রা শুরু থেকে অনেক আশায় আশায় পথ চলেছি। বিশেষ করে আমার জন্মভূমি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া স্পর্শ করে যখন বাস ছুটে চলছিল তখন ভিন্ন এক অনুভূতি জড়িয়ে ছিল। আমার শিশু, কৈশোর আর যৌবনের দিনগুলোতে দাপিয়ে বেড়ানো পথে ছুটে চলা পুরো যাত্রীবাহী গাড়ির গতি যেন হৃদয়ে স্পন্দনের গতির কাছে হার মানছিল।
আগেই বলেছি, আমি আশাবাদী, তাই ছাইয়ের মধ্যে সম্ভাবনার ছবি দেখি। সাগর কন্যা কুয়াকাটায় যাওয়ার পথে চারিপাশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মযজ্ঞ যেন সেই আশাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কোথাও সড়ক প্রশস্ত হচ্ছে। আবার কোথাও নদী ভেদ করে উপরে উঠলে বিশাল সেতু। কোথাও চলছে নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কর্মযজ্ঞ। রবিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদৃশ্য সম্মুখভাগ; আরও কত কিছু। গাড়ির মধ্যে নবীন-প্রবীণ, সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ ভুলে আনন্দ উদযাপন সবকিছু আমাদের নিত্যদিনের ব্যস্ততা ভুলিয়ে দিয়েছে। আবার মাঝে মাঝে যাত্রা বিরতি; দুই গাড়ির মানুষদের এক হওয়ার আনন্দতো ছিলই। অবশেষে দুপুর গড়াতেই পৌঁছেছিলাম সাগর কন্যার তীরে।
বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২২৫ বছর আগে বার্মার আরাকানে জাতিগত কোন্দলের কারণে রাতের আধাঁরে রাখাইন সম্প্রদায়ের ১৫০টি পরিবার ৫০টি কাঠের নৌকা যোগে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে। দীর্ঘ ৭দিন নৌকায় থেকে বসবাসের জন্য প্রথমে কক্সবাজার, পরে হাতিয়া, সন্দ্বীপ, রাঙ্গাবালী, মৌডুবী ও সর্বশেষে কুয়াকাটায় আসে। কুয়াকাটা তখন ছিল গহীন বনাঞ্চল। বসবাসের জন্য রাখাইনরা ঘাটলা (বর্তমান কুয়াকাটা) নামের এ অঞ্চলটিকেই বেছে নেয়। বন্যহিং¯্র প্রাণীদের সাথে যুদ্ধ করে বন আবাদ করে বসবাস শুরু করে। এ অঞ্চলে বসবাসে সবকিছু অনুকূলে থাকলেও সংকট দেখা দেয় খাবার পানির। এ সময় অঞ্জলি পরিবারের লোকজন কুয়া (কুপ) খনন করে মিষ্টি পানির সন্ধান পান। রাখাইনরা এ স্থানের নাম দেয় ক্যাঁচাই (ভাগ্য গড়ার স্থান)। এর আগে বৃটিশদের ঘাট থাকায় এর নাম ছিলো ঘাটলা। কিন্তু বাঙালীরা এসে রাখাইনদের কুয়াকে কেন্দ্র করে এই স্থানের নামকরণ করে কুয়াকাটা। এই কুয়াকাটার আরেক নাম ‘সাগরকন্যা’।
কুয়াকাটা দণি এশিয়ায় একটি মাত্র সমুদ্র সৈকত যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। কুয়াকাটা সমুদ্র মাত্র ২০ কিলোমিটার লম্বা। রাস্তা থেকে সৈকতে এসে নামলে ডানে লেবুচর, ঝিনুক চর, লাল কাঁকড়ার চড়, ফাতরার বন ও বামে গঙ্গামায়ার চর। এই কুয়াকাটাকে ঘিরে রয়েছে বৌদ্ধমন্দির ও রাখাইন পল্লী, জেলে পল্লী, বার্মিজ মার্কেট।
বাংলা ক্যালেন্ডার হিসেবে আমরা এবার চৈত্রের দহনের মধ্যেই সাগর ভ্রমণ করি। তা সত্ত্বেও এখানে পর্যটকের কমতি ছিলনা। হাজার হাজার পর্যটকের ভিড়ে মুখরিত ছিল পুরো সী বিচ ও পর্যটন এলাকা। এখানকার মনোহরী ব্যবসায়ীদের ব্যবহারও মনে রাখার মতো। এই ব্যবসায়ীদের আন্তরিকতা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মুগ্ধ করেছে। সাগর কূলের দুর্গম এমন একটি এলাকায় ব্যবসায়ীদের আর হোক আমার বেনিয়া মনে হয়নি। তবে হতাশ হয়েছি; খাবারের মান, হোটেল, পরিবহন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ফটোগ্রাফারদের কঠিন সিন্ডিকেট বাণিজ্যের মনোভাবের কাছে। মুদি-মনোহারী ব্যবসায়ীদের বিপরীত চিত্র খাবার হোটেল, আবাসিক হোটেল ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায়।
মানহীন খাবার দোকানগুলোতে অবাধভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার করছে মশা-মাছি। সিন্ডিকেট করে এসব হোটেলের ব্যবসায়ীরা তাদের স্বাদহীন খাবার খেতে বাধ্য করেন। দাম কষাকষি করলেও তাদের অজুহাত সমিতির। সমিতির সিদ্ধান্তেই নাকি দাম কমাতে পারছেন না। এখানে আতিয়েতা থাকলেও তাতে কৃত্রিমতার রঙ থাকে। দিন শেষে এ কষ্ট পর্যটকদের হয়তো কয়েক বার ভাবাবে।
শুধু খাবার হোটেলই নয়, আরেক সিন্ডিকেট পরিবহন ব্যবস্থাকে ঘিরে। এই এলাকার চলাচলের মূল যান মোটরসাইকেল, ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক আর রিক্সা ভ্যান। আপনি হোটেল গেটেই পেয়ে যাবেন, এসব যানবাহনের সমারোহ। কিন্তু অতিরিক্ত ভাড়া ও সিন্ডিকেটের কষ্টতো থাকবেই।
এবার ফিরে আসা যাক, সমুদ্র সৈকতে। এখানেও কক্সবাজারের মতো মিলবে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের দেখা। কিন্তু এবার কক্সবাজারের সাথে মিলাতে গেলে ধাক্কা খেতে হবে। এই ফটোগ্রাফররা নিজ গরজে ছবি তুলবেন। আপনি ওইসব ছবি নিতে পারেন বাছাই করে। মিলবে প্রিন্ট কপিও। তবে প্রিন্টমূল্য বাদে প্রতিটি ছবিতে দিতে হবে মাত্র ১০টাকা। আর ছবি তুলে এসডি কার্ড বা পেনড্রাইভে আনতে চাইলেও ছবি প্রতি পড়বে ১০টাকা। এর থেকে কোন কমবেশী নেই। অথচ একই ধরণের ফটোগ্রাফি আমরা কক্সবাজারে পেয়েছি মাত্র ২ থেকে ৩টাকায়। এ যেন দেখার কেউ নেই। এসব ফটোগ্রাফাররা জানালেন, তাদের নাকি সমিতি আছে। ওই সমিতি নাকি তাদের ছবি রেট ঠিক করে দিয়েছে। তাই তার বাইরে যেতে পারবে না। অর্থাৎ এখানেও সিন্ডিকেট। আর আবাসিক হোটেল নিয়ে তো কথা আছেই, তা না হয় আগামী কিস্তিতে বলবো।
সবমিলিয়ে অনেক সম্ভাবনাময় হিসেবে গড়ে উঠা ‘সাগর কন্যা কুয়াকাটা’ সিন্ডিকেটের কালো থাবার মুখে পড়েছে। এই সিন্ডিকেটই এক সময় দর্শনীয় এ স্থানটির বিপর্যয় ডেকে আনবে বলেই মনে হয়। মানুষ যখন পর্যটন বা ভ্রমনে যায়, তখন অনেকটা খোলামন নিয়ে যান। তারা কোথাও কোন বাধা, সংঘাতে যেতে চান না। অতিথি হিসেবে চান আতিথেয়তা। পর্যটন এলাকার মানুষ যতো আতিথি পরায়ন হবেন, ততই সেখানে অতিথিদের আগাগোনা বাড়বে। তাদের সুনাম শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষ ছুটে আসবে। আমরা ‘সাগর কন্যা’র তীরের এমন সিন্ডিকেট চাইনা। চাই হৃদয়ের ভালবাসা। এমন সুদিনের প্রত্যাশা আমি এখনও ছাড়ছি না।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক কালের কণ্ঠ, খুলনা ব্যুরো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here