ডাকসু’র ঢাক বাজুক সারা দেশে

0
94

এখন পর্যন্ত বলা যায়, এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ঢাকসু) নির্বাচন হচ্ছে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর এ নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উৎসবের আমেজ দেখা দিয়েছে। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অর্থাৎ ঢাকার বাইরে অবস্থান করছি তারা পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন পর্দায় এই আমেজ দেখতে পাচ্ছি। একজন সাবেক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এ নির্বাচন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি আনন্দিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্বাচনী পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষপের আশঙ্কার মধ্যেও আমি দীর্ঘদিন পরের এই নির্বাচন ‘ছাত্ররাজনীতি’কে নতুন পথ দেখাবে বলেই আমি মনে করছি। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোতে ছাত্ররাজনীতির প্রথম পাঠ হিসেবে পরিচিত ‘ছাত্র সংসদ’র অস্তিত অব্যাহত থাকলে আজকের মূল রাজনীতিতে চলমান সংকট দেখা দিতো না। তাই ডাকসু নিয়ে আশাবাদী হতে চাই।
আজকাল আমাদের সমাজে ছাত্রনেতা বা ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িতদের খুব একটা ভাল চোখে দেখা হয় না। ছাত্ররাজনীতি মানে ‘টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, হল দখল’ ইত্যাদি ইত্যাদি নানা ঋণাত্মক বাক্যে বন্দী করা হচ্ছে। অথচ এই ছাত্ররাজনীতিই ছিল আমাদের ঐতিহ্য ও অহংকার। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬২’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, সর্বশেষ একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধী আল-বদর, রাজাকার, আল-শামস্দের ফাঁসির দাবির আন্দোলন, কোঠা বিরোধী ও নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনও এদেশের ছাত্রদের সৃষ্টি। ছাত্র আন্দোলনগুলো গড়ে অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। রাজনীতিবিদরা কখনো ব্যর্থ হলেও এদেশের ছাত্রসমাজ কখনো দমে যায়নি বা ব্যর্থ হয়নি। কিন্তু কেমন করে সেই ছাত্রসমাজই সমাজে অপাক্তেয় হলো তা আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন রয়েছে।
আমরা যে ঐতিহ্যের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস দেখে এসেছি, সে ইতিহাস অনেকটা ছাত্ররা নিজেরাই গড়ে তুলেছিল। রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির বাইরে বেরিয়ে তখনকার ছাত্ররা সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিগুলি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই ছাত্রদের সকল আন্দোলন গড়ে উঠেছে আমজনতার আন্দোলন হিসেবে। ৯০ দশক পর্যন্ত ছাত্ররা কিছুটা হলেও তাদের ওই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পেরেছিলেন। ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাবো; শুধু ছাত্ররাজনীতিই নয়, মূলত : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশের সকল রাজনীতিরই পশ্চাৎগামীতা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তী সামরিক শাসকদের অবৈধ ক্ষমতারোহনের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সামরিক শাসকরা মূলত দেশের অগ্রগর অংশ হিসেবে পরিচিত ‘ছাত্রসমাজ’কে টার্গেট করে। শুধু টার্গেটই নয়, এ ক্ষেত্রে তারা অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করে। যার প্রভাব পড়তে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলেতে। যে ছাত্ররা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির বিরোধীতায় সরব ছিল, তাদের একটি অংশ রাজনীতির লেজুড়ে পরিণত হয়। শুরু হয়, ক্যাম্পাস দখল, হল দখল, মারামারি ও খুনোখুনি। অবৈধ অস্ত্র ও অর্থের প্রভাবে ৮০ থেকে ৯০’র দশকে ক্যাম্পাসগুলো সন্ত্রাসীদের অভায়রণ্যে পরিণত হয়। খাতা-কলমের পরিবর্তে ক্যাম্পাসে বুলেট-বন্দুকের দাপট বেড়ে চলে। ছাত্ররাজনীতিতে মেধাবীদের আগ্রহ ও আদর্শিক লড়াই কমতে শুরু করে। মেধাশূণ্য হতে থাকে রাজনীতির প্রথম পাঠ ‘ছাত্ররাজনীতি’। যার কারণে এদেশের রাজনীতিতে ৯০’র পরবর্তী ছাত্রনেতাদের সংখ্যা অনেকটা হাতে গোনা। ৯০ থেকে বর্তমান পর্যন্ত গেল ২৯ বছরের রাজনৈতিক নেতৃত্বে একটি বিরাট শূণ্যতা তৈরী হয়েছে। ফলে রাজনীতিতে ব্যবসায়ী, আমলা ও অবসরপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ছে। যা রাজনীতি ও দেশের জন্য শুভকর হচ্ছে না।
বলছিলাম ঢাকসু নির্বাচন নিয়ে, আমি চাই এই নির্বাচনের আমেজ সারাদেশের উচ্চ শিক্ষা ও কলেজগুলোতে ছড়িয়ে পড়–ক। আর এটি যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, ততই শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গলজনক হবে। আমি ৯০ পরবর্তী ছাত্ররাজনীতির সক্রিয় কর্মী ছিলাম। খুলনায় রাজনীতির সুবাদে ক্যাম্পাস থেকে ক্যাম্পাসে গিয়েছি। থানা উপজেলা থেকে শুরু করে গ্রামের পথে হেটেছি। এখন ছাত্ররাজনীতিতে এ কাজ অনেক কমে গেছে। আমরা তখন আমাদের সংগঠন ও জোটের সম্ভাব্য প্রার্থীর নিয়ে ভাবতাম। কাসে কাসে রুটিন কার্ড, ইস্যুভিত্তিক লিফলেট বিতরণ, মিছিল ছিল নিত্য কর্মসূচি। কলেজে ভর্তিকালীন সময়ে ছাত্রসংগঠনের নেতারা নবীন শিক্ষার্থীদের বরণে প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতেন। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ভর্তি কোচিং, বেতন বইয়ের মাধ্যমে বেতন পরিশোধ, বেতন মওকুফের মতো কাজে ব্যস্ত সময় পার করতেন। কলেজে বাস নেই, পাঠাগার নেই, শৌচাগার সমস্যা- যে কোন আন্দোলনে সামিল হতেন। বেতন বা পরীক্ষা ফি বৃদ্ধি হলে তো কথাই ন্ইে। তখন আমাদের কর্মীদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরী হয়েছিল, ছাত্ররাজনীতি করতে হলে ছাত্রদের মন জয় করতে হবে। নিজেকে ভাল ছাত্র হতে হবে, আবার সব সমস্যা সমাধানে ক্ষমতাধর হতে হবে। এখানে মাস্তানি করা যাবে না। আবার ‘ভিজে বেড়াল’ হওয়া চলবে না। ধীরে ধীরে সেই অবস্থা পাল্টে গেছে। শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্রদের এক অংশের মধ্যে সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের বীজ বপণ করা হয়েছে। যা শেষ পর্যন্ত মহীরুহ হয়ে দেখা দিয়েছে। ক্যাম্পাস অস্থিরতার সুযোগে একে একে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কলেজগুলোর ‘ছাত্র সংসদ’গুলোর নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে ছাত্র বান্ধব ছাত্রনেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা না ভেবে রাজনীতির লেজুড়ে পরিণত হয়েছে। পেশীশক্তিকে ব্যবহার করছে। আর এসবে সুযোগ নিচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণির কর্তা ব্যক্তিরা। তারাও এ সুযোগে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ছাত্র সংসদ’ না থাকলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা আদায় করা হয়। যার ব্যয় নিয়ে কোন জবাবদিহিতা থাকে না। এসব অর্থ অনেকটা নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়। তাই তারাও চান না ‘ছাত্র সংসদ’ ফের চালু হোক। ছাত্ররাজনীতির সুদিন আসুক, জবাবদিহিতা বাড়–ক।
বর্তমান সরকার ছাত্ররাজনীতির সুদিন ফেরানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে; তা নি:সন্দেহে সাহসী উদ্যোগ। এই উদ্যোগ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এই ‘ঢাক’র বাজনা ছড়িয়ে পড়–ক। আমরা আমাদের ছাত্রনেতাদের আবারও ছাত্র বান্ধব দেখতে চাই। দেখতে চাই টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসামুক্ত ছাত্রনেতা। তাহলে আজকের ছাত্রনেতারাই আমাদের সোনার বাংলাকে যর্থাথ নেতৃত্ব দেবে সন্দেহ নেই।
লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ, খুলনা ব্যুরো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here