আমার মায়ের ভাষা, আমার ভাষা

0
114

কৌশিক দে
সকালটা খুব মনে পড়ে। ঘুম কাতুরে আমিও থাকতাম উত্তেজনায়। খালি-পায়ে শিশির সিক্ত মেঠো পথ, কুয়াশা পেরিয়ে ছুটতাম স্কুলের উদ্দেশ্যে। নিজ হাতে তৈরী ফুলের মালা হাতে সেই ছুটে চলা যেন এখনও চোখের পটে ফেসে উঠে। স্কুলে পৌঁছে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কলা গাছের তৈরী অস্থায়ী শহীদ মিনারে সেই শ্রদ্ধা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি….’ গানে সম্মিলিত গলা মিলানো; এখন আর হয়ে উঠে না। এইতো আমাদের অহংকার, এইতো আমার ভালবাসা ‘মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’ সম্মিলিত কণ্ঠে গান হতো, ‘মা তোর ৮ই ফাল্গুনের কথা আজও ভুলি নাই…’। আজ সবকিছুই স্মৃতি। খালি পায়ে বুকে কালো ব্যাচ পড়ে ‘প্রভাত ফেরিতে’ অংশগ্রহণ করা আর হয়ে উঠে না। জীবন-জীবিকা আর সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছুই পাল্টেগেছে। যে একুশ আমাদের চেতনায় শানিত করতো, সেই একুশ এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিয়েছে। প্রথম প্রহরে তীব্র প্রতিযোগিতায় শহীদ বেদী শ্রদ্ধা নিবেদন। রাতের আঁধারে (কেউ কেউ) প্রভাত ফেরির কাজ শেষ করে ফেলা আর কিছু আলোচনা-অনুষ্ঠানেই দিনটি পার হয়ে যায়।
সময়ের সাথে অনেক কিছুই পাল্টে যায়। আমরাও পাল্টে যাচ্ছি। অনেক দিনের চেনা মানুষগুলোও কেমন যেন বদলে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়-এটাকেই বলে সময়। আমাদের কালো চুলগুলোতে পাক ধরছে। শিশু, কিশোর, যুবক থেকে ছুটে চলছি মধ্য বয়সে- তাই হয়তো সব পাল্টানোর দৃশ্যগুলো বেশী দৃশ্যমান হচ্ছে। আর এভাবেই আমাদের ৮০ থেকে ৯০ দশকের মহান শহীদ দিবস পাল্টে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানদের ‘মহান শহীদ দিবস’ কবে জানতে চাইলে তাই তারা দ্বিধায় পড়ে যায়। তারা বেশী হলে একুশে ফেব্রুয়ারিকে জানে, তারা ৮ই ফাল্গুনের কথা বুঝতে পারেনা। আমাদের ভাষার মাসে ভালবাসার কোন কমতি নেই। আমরা একে একে ডুবে যাই,‘হাগ ডে’, ‘কিস ডে’, ‘প্রপোজ ডে’, ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’সহ আরও কত দিবসে। এতো সব দিবস আর ‘ডে’র মাঝে সত্যিই অসহায় আমাদের ‘শহীদ দিবস’।
১৯৫২ থেকে ২০১৯ ব্যবধান ৬৭ বছরের। এ এক দীর্ঘ সময়। বাহান্নের ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছে ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও সর্বপরি একাত্তরের মহান মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই ইতিহাসের ক্ষয় নেই। ভাষার জন্য জীবন দেয়া পৃথিবীতে একমাত্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত বাঙালীরা। তাই বিলম্বে হলেও এসেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আজ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আমাদের ‘মহান শহীদ দিবস’ সবকিছু ছাপিয়ে এখন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাষ শহীদ রফিক, শফিক, বরকত, সালামসহ বীর সেনানীরা আমাদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলা ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা। এ ভাষার মাধুর্য্য অন্য কোন ভাষার সাথে তুলনা হতে পারে না। তারপরও এ ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা অনেকটা উদাসীন। আধুনিকতার নামে প্রতিনিয়ত আমরা আমাদের ভাষার মাধুর্য্যকে নষ্ট করে চলছি। এক সময়ে ‘পত্রমিতালী’ নামে বিভিন্ন সাপ্তাহিক, মাসিক ও ত্রৈ-মাসিক পত্রিকা বা প্রকাশনায় একটি বিভাগ চালু ছিল। ওই বিভাগটি এতোই জনপ্রিয় ছিল যে, চির অচেনা মানুষ সহসা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতেন। সেখানে শ্রেণি, ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে যেতেন। আজ আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি আমাদের সে বন্ধন থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। ভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে বাংলা ভাষাকে বিকৃতরূপ দেয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে এফএম রেডিও ও টেলিভিশনগুলো এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। শুধু তাই নয়, আমাদের নাটক, নাটিকা, সিনেমাসহ আঞ্চলিক ভাষাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে। এই নতুন প্রজন্মও নিজের ভাষাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বের সাথে তাল মেলানোর প্রশ্নেও নিজেদের ভাষাকে অবজ্ঞা করি। বিশ্বকবি রবি ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, পরে ইংরেজি শিক্ষার পত্তন’ – বাস্তব এ কথা আমরা ভুলে যাই ও যাচ্ছি।
একটু খেয়াল করলেই আমরা আমাদের বাংলা ভাষার ব্যাপকতা বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি। আমরা দেখি ইংরেজি ভাষার বর্ণ সংখ্যা ২৬। যেখানে আমাদের স্বরবর্ণের সংখ্যা ১১টি ও ব্যাঞ্জন বর্ণের সংখ্যা ৩৯টি। সবমিলিয়ে মোট বর্ণসংখ্যা ৫০টি। এতো গেল বর্ণ রহস্য। আরও আছে, আমরা সহজেই কে আমার বাবার বোন, কে আমার মায়ের বোন বা ভাই বোঝাতে পারি। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় ‘আঙ্কেল/আন্টি’তেই অনেক সর্ম্পক সীমবদ্ধ থাকে। এই বাংলা আমার মায়ের ভাষা। এতো মধুর ভাষা আর কোথায় আমরা পাই। এ ভাষা শুধু একটি দিন, মাস বা বছরের জন্য নয়, চির জীবনের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্য। শুধু একদিন ‘বর্ণ’ আঁকা পোষাকে বাংলা ভাষাকে শ্রদ্ধা জানানো যায় না। এজন্য চাই সত্যিকার অর্থে বাংলা ভাষাকে ভালবাসা। শুদ্ধ উচ্চারণ, লেখনী এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি চাই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন। এই কাজটির মাধ্যমে আমাদের ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগকে যথার্থ সম্মান জানানো হবে।
লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ, খুলনা ব্যুরো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here