ব্রিজের ভাঙা পিলার কপোতাক্ষের গলার কাঁটা

0
11

পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায় মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ বিখ্যাত ব্যক্তির স্মৃতি বিজড়িত মৃত কপোতাক্ষ নদ প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ফিরে এসেছে নদের স্বাভাবিক গতির জোয়ার-ভাটা। প্রায় ৩শ কোটি টাকা ব্যয়ে নদ খনন করা হলেও গলার কাঁটা স্বরূপ নদের মাঝখানে অসমাপ্ত ব্রিজের ভাঙ্গা পিলার আজো অপসারণ করা হয়নি। একদিকে নৌপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নদের বুকে পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কপোতাক্ষ নদ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। বহু কালের স¦াক্ষী এ নদ। কপোতাক্ষ নদের দু’তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাণিজ্যিক নগরী ও বসতী। নদকে ঘিরে সু-প্রাচীন কাল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন জীবিকার নির্ভর করে আসছে। এককালের ভয়াল কপোতাক্ষ নদের মৃত্যু উপকূলীয় মানুষের জীবন জীবিকার চালিকা শক্তি থমকে দাঁড়ায়। তাই নদকে বাঁচাতে শুরু হয় আন্দোলন সংগ্রাম।
সরকার এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ দূর্দশা লাঘবে ২০১১ সালের নভেম্বর একনেকর সভায় ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা নদ খননে বরাদ্ধ দেন। কপোতাক্ষ নদ খনন হলো, ফিরে পেলো নতুন জীবন। সত্যি হলো স্বপ্ন। আবার যখন জীবিকার চালিকা শক্তি স্বচল হতে শুরু হলো তখন নদ ভরাটের দুঃচিন্তা ভর করেছে এলাকার মানুষের মাঝে।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি থেকে সাতক্ষীরা সদর হয়ে সরাসরি কলিকাতা যাওয়ার সড়ক নির্মাণে স্বপ্ন দেখেন প্রায় শত বছর পূর্বে আধুনিক কপিলমুনি (বিনোদগঞ্জ) বাজারের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু। সে মতো টাকাও সঞ্চয় করে ছিলেন তিনি। তৎকালীন কিছু প্রতিবন্ধকতায় সে সময়ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি ব্রিজ নির্মাণ। তবে তৎকালীন সময় ব্রিজ নির্মাণে টাকা কলিকাতা সেন্ট্রাল ব্যাংকে জমা রাখেন বলে তার জীবনী গ্রহন্থ থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় এলাকাবাসীর দীর্ঘ দীন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে কপিলমুনি কপোতাক্ষ নদের উপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য। তারই ফলশ্রæতিতে ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সকল প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করে ব্রিজ নির্মাণ কাজে হাত দেয়। কাজ কিছু দিন চলার পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম দূর্নীতির ফলে বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় ব্রিজের আংশিক কাজ সম্পূর্ণ হয়। পরবর্তীতে পলি পড়ে কপোতাক্ষ নদ একবারেই নাব্যতা হারায়। সে সাথে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ও স্বপ্নের মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তৎকালিন সময় কপিলমুনি-সাতক্ষীরার জেঠুয়া ব্রিজ নির্মাণ কাজে ব্যয় ধার্য করা হয় ১ কোটি ৯৩ লাখ ৪২ হাজার ৯০০শত ১৯ টাকা ৫৫ পয়সা। কাজের মান প্রশ্নে পরবর্তীতে তা বৃদ্ধি পায় ২কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। নির্মাণের দায়িত্বপায় এন হক এসোসিয়েট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কার্যক্রম শুরু করে ২০০০ সালের ১২ই এপ্রিল।
এরপর ঐ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক কাজ করে আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা হতে ১কোটি ৬৭লাখ ৭২২টাকা উত্তোলণ করে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী পর্যায় বিষয়টি নিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। খুলনা মহানগর হাকিম আদালতে দায়েরকৃত মামলা নং পি-৫৮/০৬ ধারা ৪০৬/৪২০/১০৯/৩৪। যার ফলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা সহ নানা জটিলতা ও দীর্ঘ সূত্রতার কারনে ব্রিজ নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ব্রিজটির বাকী কাজ সমাপ্ত করতে ইসলাম গ্রæপ নামের আরো একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পুনরায় উক্ত নির্মাণ কাজ শুরু করে।
সে সময় সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড কপোতাক্ষ নদের ¯্রােত বাঁধা পাবে মর্মে একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়ে দেওয়ায় ব্রিজ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নদের বুকে ১৫টি পিলার মাথা উচু দাঁড়িয়ে থাকে। ২০০৮ সালে সেনাবাহিনী নির্দ্দেশে পিলারের উপরে অংশ ভেঙ্গে ফেলা হয়। পরবর্তীতে নদ খনন করা হলেও নিচের অংশ আজও অপসারণ করা হয়নি। নদী খননে জেগে উঠা পিলারগুলো একদিকে জোয়ার-ভাটা ও নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে নদের বুকে পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে।
এ বিষয়ে কপিলমুনি (বিনোদগঞ্জ) বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সরদার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার, ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা খরচ করে এলাকার জনস্বার্থে নদী খনন করেন সরকার, কিন্তু নদীর মাঝখানকার ১৫ টি পিলার উপড়ে না ফেলায় নৌযান চলাচলে বাঁধাগ্রস্ত ও জোয়ার ভাটা বাঁধপ্রাপ্ত হয়ে পলি জমে ভেস্তে যেতে পারে সরকারের সদিচ্ছা।’
কপিলমুনি ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ কওছার আলী জোয়ার্দার বলেন, ‘ভাঙ্গা পিলারে জোয়ার ভাটায় বাঁধা সৃষ্টি হয় নিয়মিত। যার কারণে নদীতে পলি জমা হচ্ছে। আর সে কারণে কপোতাক্ষ নদের আবারও নাব্যতা হারানোর আশংকা দেখা দিয়েছে।’
খুলনা-৬ আসনের এমপি আলহাজ্ব মোঃ আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সু-দৃষ্টির কারণে কপোতাক্ষ নদী নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কপোতাক্ষ নদ খনন এলাকার মানুষের সংগ্রামের ফসল । তা যদি আবার ভরাট হয় ভাঙ্গা পিলারের কারনে, তবে তা হবে দুঃখ জনক। জনগনের সুবিধার জন্য যেটা করলে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে সেটা করবো।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here