মাননীয় মেয়র আপনাকে অভিনন্দন : ভাল কিছুর অপেক্ষায় আমরা

0
126

কৌশিক দে
সময়টা ২০১৬ সালের মধ্য মে। আজ থেকে প্রায় তিন বছরের বেশী আগের কথা। আমরা এই কলামেই লিখেছিলাম ‘খুলনার সম্মানিত জনপ্রতিনিধি বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন সমীপে : আমরা স্বাভাবিক জীবন চাই’। ওই লেখা ছিল নগরজীবনে যন্ত্রদানব হয়ে উঠা ইজিবাইক, মাহেন্দ্র, নন্দী ও ব্যাটারি চালিত রিক্সার যন্ত্রণা নিয়ে। লিখেছিলাম ওই বছরের একুশে বইমেলায় যাওয়ার পথে পরিবারসহ দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার কষ্টগাঁথা নিয়ে। কিন্তু সেই কষ্ট ও আবেদনে তখন খুব সাড়া পাইনি। আমাদের নিত্যদিনের দুর্ভোগ থেকে গেছে। ওইসব ভয়ঙ্কর যানের দাপটে তাই প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন দুর্ঘটনার খবর পেয়েছি। আমার আমার কোন বন্ধু, স্বজন বা পরিজনরা খবরের সৃষ্টি হয়েছেন।
আমারা যারা খুলনায় বসবাস করি, তারা নানা কারণেই গর্ববোধ করি। পারত পক্ষে এ শহর ছাড়া অন্য কোথায়ও গিয়ে এ শহরের বাসিন্দারা স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। ব্যক্তিগতভাবে আমিও কখনো ঢাকায় কোন কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রোগ্রাম পড়লে মনখারাপ করে ফেরি। ইচ্ছে হয় না, ২/১ দিনের জন্য সেখানে যাই। তাই এই শহরের ভাল কিছু দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। এখন যেমন, প্যানা ব্যানারহীন শহর ঘুরতে ভাল লাগে। তবে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্যানা-পোস্টার এখনও পীড়া দেয়। বলছিলাম খুলনার ভাল কোন কিছুর খবরেই আমাদের আনন্দ হয়। দীর্ঘদিন পর আমরা সেটি উপভোগ করছি। এখন এই ভাললাগা শহরে নির্বিঘেœ পথচারীরা চলাচল করতে পারছেন। আমরা মোটরসাইকেল আরোহীরাও স্বস্তিবোধ করছি। বেপরোয়া ইজিবাইক, মাহেন্দ্র থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাচ্ছি। ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় এ স্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক নির্বাচন পূর্ব যেসকল প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন; তার বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। ইজিবাইক, ব্যাটারি চালিত রিক্সা বিপদমুক্ত করার পাশাপাশি নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ময়ূর নদীসহ ২২ খাল দখলমুক্ত করাও উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন কমিটি এই উচ্ছেদ অভিযানকে সমর্থন দিয়ে কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে সামনে আরও ভালকিছুর অপেক্ষায় রয়েছে নগরবাসী। এই শহরের একজন নাগরিক হিসেবে তাই অভিনন্দন জানাতে চাই। জানাতে চাই, মাননীয় মেয়র নগরবাসীর জন্য আপনার যে কোন ভাল উদ্যোগে তারা আপনার পাশে থাকবেন। আমাদের প্রিয় নগরকে মাদক, সন্ত্রাস, দখলদারমুক্ত করতে আপনার সাহসী উদ্যোগ তাই নতুন করে আশা জাগিয়ে তুলছে। আমরা আবার যানজটমুক্ত ও পরিবেশ বান্ধব মহানগরী দেখতে চাই। তাই আপনাকে আবারও অভিনন্দন।
ইজিবাইক, মাহেন্দ্র যন্ত্রণা খুলনাবাসীর জন্য খুব বেশী দিনের নয়। ২০১০ সালের দিকে নগরাবাসীর কাছে আশা জাগিয়ে এ যন্ত্রণা শুরু হয়। ২০১০-১১ অর্থ বছরের কর্পোরেশন নগরীর চলাচলের জন্য দুই হাজার ইজিবাইকের লাইসেন্স প্রদান করে। পরে এর মধ্যে থেকে ৩৭টির লাইসেন্স স্থগিত রেখে ৯৬৩টি ইজিবাইকের লাইসেন্স প্রদান করা হয়। লাইসেন্সপ্রাপ্ত এ ইজিবাইকগুলো ২০১১-১২ অর্থবছরের জন্যে কেসিসি নবায়ন করে চলাচললের অনুমতি অব্যাহত রাখে। ২০১৩ সালের শেষের দিকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় (এলজিইডি) থেকে ইজিবাইকের লাইসেন্স প্রদান বন্ধ রাখার জন্য কেসিসিকে নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেয়। এরপর ইজিবাইকের লাইসেন্স প্রদান করা বন্ধ রাখে খুলনা সিটি কর্পোরেশন। পরে নগরীতে ইজিবাইক চলাচলের জন্যে আর কোন লাইসেন্স প্রদান করেনি। কিন্তু নগরীতে ইজিবাইক বিক্রি জন্য যানবাহন ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা অব্যাহত রাখা ও এ যান বন্ধে তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ওই বাইকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৬ সালের ১১ মে খুলনার তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আবদুস সামাদ একটি সভার আহŸান করেন। ওই সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও খুলনা জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় নগরীতে ইজিবাইকের সংখ্যা ৫ হাজারে নামিয়ে আনা, ইজিবাইকের শো-রুম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নানা কারণে ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থমকে থাকে। পরবর্তীতে ফের বিভাগীয় প্রশাসনের নির্দেশে সেই তৎপরতা শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ৪ অক্টোবর নগর ভবনে ইজিবাইক ও যানজট নিরসন সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে তৎকালীন মেয়র, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ওই বৈঠকে পূর্বের ১ হাজার ৯৬০টি ইজিবাইকের সঙ্গে নতুন করে আরও ৩ হাজার ৪০টি ইজিবাইকের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এক্ষেত্রে নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা অথচ ইজিবাইক চালক এমন লোক অগ্রাধিকার পাবে। ওই সব ইজিবাইকে সবুজ রং দিয়ে মার্কিং করা হবে। এছাড়া বাইরে ইজিবাইক (জেলার) নগরীতে আসতে পারবে না। খুলনা-২ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিযান, তৎকালীন সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ এসব ইজিবাইক বাছাইয়ে সুপারিশ করবেন। মূলতঃ এই ৪ জনের যে কোন একজনের সুপারিশেই ৩ হাজার ৪০টি ইজিবাইককে নতুন করে অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে ব্যাপারেও পরবর্তীতে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ দৃষ্টি গোচর হয়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৫ মে সিটি নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় নগরীর সড়ক শৃঙ্খলা ও বিশেষ করে ইজিবাইক যন্ত্রণা। বর্তমান সিটি মেয়রের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতির অন্যতম অঙ্গীকার ছিল এ সংকট নিরসন।
মাননীয় মেয়র, পত্রিকান্তরে খবর বেড়িয়েছে; আপনি যখন ময়ূর নদীসহ খুলনার ২২ খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন, তখন একশ্রেণির দখলদার নতুন কৌশল অবলম্বন করে দখলত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আমরা বিশ্বাস করি এই চক্র যতোই প্রভাবশালী হোক না কেন, জনস্বার্থের কাছে তারা টিকে থাকতে পারবে না।
মাননীয় নগর পিতা, আপনার সমীপে সড়ক, ড্রেন দখল করে দীর্ঘদিন নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখার আরও একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আপনি খুলনার প্রতিটি সড়ক সর্ম্পকে অবগত রয়েছেন। এসব সড়কে কোন অংশ দখল থাকলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কমতি থাকে না। বিশেষ করে নগরীতে দ্রæতগতির ব্যাটারি চালিত রিক্সার কারণে পথচারীদের বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। নগরীর অলিগলিতে এ কারণে প্রায় পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হন। তাই এই বিষয়ে আপনার সুদৃষ্টি কামনা করছি। আপনার নাগরিক বান্ধব প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের নাগরিক জীবনে স্বাচ্ছন্দময় করে তুলবে সন্দেহ নেই। আপনার জন্য অযুত শুভ কামনা।

লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের কণ্ঠ, খুলনা ব্যুরো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here