নতুন সরকার ও ভবিষ্যৎ আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন যাত্রা

0
62

কৌশিক দে
অনেক জল্পনা-কল্পনা ছাপিয়ে শেষ হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বলা যায়, নির্বিঘœভাবেই সারাদেশে দুএকটি ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শেষ হয়। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতা গ্রহণ করে দেশে অন্যন্য রেকর্ড গড়েছে। নির্বাচনী ফলাফলে চমকের পর সরকার গঠনেও আওয়ামী লীগ প্রধান অন্যরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অপেক্ষাকৃত একঝাঁক নতুন মন্ত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন তিনি। সবমিলিয়ে গেল বছরের শেষ দিকের নির্বাচন ও তৎপরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনার রেশ কাটছে না। রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে সর্বত্রই এখন আলোচনায় এখন নির্বাচন, সরকার গঠন ও ভবিষ্যৎ আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন যাত্রা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারের জাতীয় নির্বাচন ছিল অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। নির্বাচনের আগ মুর্হূত পর্যন্ত এ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয় কাটছিল না। নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগে সরব ছিল রাজনৈতিক মাঠ। পাশাপাশি দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের রাজনৈতিক তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুতেও দেশের রাজনীতিতে নতুন নতুন চমক দেখেছে সাধারণ মানুষ। জোট- ফ্রন্ট গঠনের তোড়জোর আর আলোচনায় সরব হয়ে উঠে দেশ। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ও তাদের মিত্ররা নির্বাচনে যাবে কিনা এ নিয়ে যুক্তি ও পাল্টা যুক্তিও চলে। তবে সব যুক্তি ও তর্ক পিছে ফেলে নির্বাচনের পথেই হাটে বিএনপি। এবার বিএনপির সাথে এক সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, এস এম এ রব, কাদের সিদ্দিকী, হোসেন মনসুররাও মিলিত হন। এবার গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জোটের এই অংশের নেতারা সব সময় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত ইসলামীর বিরোধীতা করলেও শেষ পর্যন্ত তারা নীরবতা পালন করেন। একই সাথে জামায়াতের সাথে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামিল হন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এই জোট শরীকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিও খুব জোরালো ছিল না। এমন কী এমন প্রশ্নে ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের রিরূপ মন্তব্য করতে পিছপা হয়নি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত এ ইস্যুতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফন্ট নির্বাচন জমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তবে তারা যতটা গণমাধ্যমে সরব ছিলেন, তেমনটা মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়নি। তাদের অভিযোগ ছিল, সরকার ও তাদের আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী কোনভাবে তাদের মাঠে দাঁড়াতে দিচ্ছেনা। একের পর এক গ্রেপ্তার, মামলা ও হুমকিতে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারে যেতে পারেনি। ফলে একতরফাভাবে ক্ষমতাসীনরা মাঠ দখলে নিয়েছে। এমন অভিযোগের সাথে তারা পর্যন্ত নির্বাচন থেকে কোনভাবে সরবে না বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিল। ৩০ডিসেম্বর ২০১৮ এর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাই স্থানীয়ভাবে প্রার্থীরা দুপুরের দিকে কেউকেউ নির্বাচন বর্জন করলেও ফ্রন্টগতভাবে তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই জোটের শেষ রক্ষা হয়নি। নির্বাচনে জোটটির শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭টি আসন।
নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ২৯৯টি আসনের হিসেব দাঁড়ায়; আওয়ামী লীগ ২৫৭টি, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ২২টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ৬টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ২টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ ২টি, গণফোরাম ২টি, জাতীয় পার্টি-জেপি ১টি এবং তরিকত ফেডারেশন ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনে ৩ জন স্বতন্ত্র সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ার কারণে একটি আসনে ভোটের আগেই নির্বাচন স্থগিত করা হয়। এছাড়া একটি আসনের নির্বাচন স্থগিতের পর পরবর্তীতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
মূলত : নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভ‚মিধস বিজয়; নির্বাচন পূর্ব অনেক ধারণাকেই পাল্টে দেয়। অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করা এ জয় মূলত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের উন্নয়নের পক্ষেই মানুষ রায় দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের জাগরণ নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে বলে মনেহয়।
অপরদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর চমক লাগানো মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত সোমবার (৭ জানুয়ারি) বঙ্গভবনের দরবার হলে বিকাল ৩টা ৪৬ মিনিটে মন্ত্রিসভার ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী ও তিনজন উপমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এর আগে সাড়ে ৩টার দিকে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকার গঠিত হলো। নতুন মন্ত্রীসভা থেকে শুধু হ্যাভিওয়েট বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতারাই নন, তাদের দীর্ঘদিনের জোট ১৪দলের শরীকরাও বাদ পড়েছেন। তারুণ্য নির্ভর মন্ত্রীসভা এই নতুন সরকারের দ্বিতীয় চমক। আবার এবারের সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আরেকটি নতুন রেকর্ড গড়বেন। তিনি বাংলাদেশে ২০ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনাকারী প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি পাবেন। এটা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি রেকর্ড। এর আগে বাংলাদেশে যারা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের কেউই চারবারের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাননি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ২১ বছর পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিজয়ী হলে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বার শপথ গ্রহণ করেন তিনি। শুধু রেকর্ড বা পরিসংখ্যানই নয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কর্মদক্ষতায় ইতিমধ্যে বিশ্বনেতার আসনে অধিষ্ঠ হয়েছেন। দূর দৃষ্টি সম্পন্ন চিন্তাচেতনা ও পরিকল্পনায় তিনি এক সময়ের দরিদ্র বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর করেছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক বুক নতুন আশার সঞ্চার করেছেন। যার বাস্তব প্রতিফলন সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচন।
আমাদের জাতীয় জীবনে পুরাতন বছর শেষে এবার নতুন বছর অন্যরকমভাবে এসেছে। একদিকে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু অন্যদিকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতাকে সাধারণ মানুষের ‘না’ বলা- দুইয়ে মিলে নতুন আবহ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি নতুন সরকারের উপর দায়িত্ব ও জনপ্রত্যাশা অনেকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে নিরুঙ্কুশ জয় যেমন ক্ষমতাসীনদের তৃপ্তি দিয়েছে, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক অনেক বেশী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে প্রশাসনিক দুর্নীতি, অনিয়ম, সুবিধাবাদী চক্রের মূলোৎপাটন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এ লড়াই হতে হবে আদর্শিক ও বাস্তবভিত্তিক। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া কোনভাবেই দেশের সর্ববৃহৎ ‘পদ্মাসেতু প্রকল্প’ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপন, আন্তর্জাতিক বেনিয়াদের প্রত্যাখ্যান ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করা তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই এদেশের নতুন প্রজন্ম তাঁর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা)’র উপরই আস্থা রেখেছে।
বিগত ১০ বছরে দেশে শুধু দৃশ্যমান উন্নয়নই হয়নি। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ নতুন আসনে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত হয়। এক সময়ের মঙ্গা কবলিত এলাকার মাঠে ফসলের উৎসব হয়। আবার আমাদের যেখানে ৭ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য যোগানো সম্ভব ছিলনা। এখন ১৭ কোটি মানুষের দেশেও খাদ্য উদ্ধৃত্ত হয়। কৃষি ও কৃষক, শ্রমিকের মুখে হাসি ফোঁটে। আমরা কৃষক-শ্রমিকের এ হাসি অব্যাহতভাবে দেখতে চাই। চাই অনিয়ম, দুর্র্নীতি, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সোনার বাংলাদেশ। চাই নিরাপদ জীবন। তাহলেই মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
লেখক : নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ, খুলনা ব্যুরো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here