খুলনার দুটি আসনে জামায়াতকে ছাড় দিতে চায় না তৃণমুল বিএনপি

0
17

স্টাফ রিপোর্টার
খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে দুটি আসনে (খুলনা-৫ ও ৬) আসনে জামায়াতের প্রার্থীকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেনা বিএনপির তৃণমুল পর্যায়ের নেতারা। ইতোমধ্যেই জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে খুলনা-৫ ও ৬ আসনটিতে ২০ দলীয় জোট প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং খুলনা মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রার্থীতা চুড়ান্ত করেছে নীতিনির্ধারক কমিটি। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার বাকী। আর গ্রীণ সিগন্যাল পেয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীরা কাজ শুরু করেছে।
অপরদিকে এ দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থীকে জোটের চুড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোণণার দাবি জানিয়েছে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। তারা বলেছেন এ দুিিট আসনে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি শক্ত ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে আছে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা অভিযুক্ত এবং নাশকতাসহ নানা অভিযোগে দলটির তৃণমূল বিপর্যন্ত হয়ে পড়ায় সাংগঠনিকভাবে তারা দূর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়া অসম্ভব।
একাধিক সূত্র জানায়, খুলনা-৫ আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনে ডুমুরিয়া উপজেলা আ’লীগ সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে ৪ হাজার ভোটে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন জামায়াতের গোলাম পরওয়ার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নারায়ণ চন্দ্র চন্দের কাছে ৩৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এবার নির্বাচনে মহাজোটের একক প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। আর ২০ দলীয় জোট প্রার্থী হয়েছেন তিন জন। তারা হলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ড. মামুন রহমান ও অধ্যাপক ডাঃ গাজী আব্দুল হক। জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের নামে ২৩টি বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমকম (হিসাব বিজ্ঞান)। রাখি মালের ব্যবসা করেন। বার্ষিক আয় ব্যবসা থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ১ হাজার ৩৬১ টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে প্রায় ২৮ লাখ টাকার। একই আসনের প্রার্থী বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মামুন রহমান পেশায় একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। কিন্তু তার বার্ষিক কোনো আয় ও স্থাবর সম্পত্তি নেই। অস্থাবর হিসেবে নগদ সাড়ে ৬ লাখ টাকা, ব্যাংকে ২৬ হাজার এবং বন্ড, শেয়ারপত্র কেনা রয়েছে ৬৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকার। তার নামে বিএনপি নেতা ও ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মিঠু হত্যা মামলা রয়েছে।
এ আসনে বিএনপির অপর প্রার্থী সাবেক সাংসদ ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি গাজী আবদুল হক অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক। শিক্ষাগত যোগ্যতা এমফিল। বার্ষিক আয় কৃষি খাতে ১ লাখ, বাড়ি ভাড়া ৫ লাখ ২৮ হাজার, পেনশনে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকাসহ ২০ বিঘা জমি ও সাড়ে ৭ কাঠার বাড়ি।
২০ দলীয় জোট প্রার্থী দাবিদার জামায়াতের নায়েবে আমীর গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা-৫ ও ৬ আসন জামায়াতের আসন। জোটগতভাবে এই আসন দুটিতে জামায়াতের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দিতা করে আসছে। এবারও জোট এ দুটি আসনে আমাদেরকে ছাড় দিয়েছে। জোটগত নির্বাচনে আমাদের কোন সমস্যা নেই।
এ আসনের প্রার্থী দাবিদার বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মামুন রহমান বলেন, বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কৌশলের অবলম্বন নিয়ে একবারমাত্র এই আসনে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচিত হলেও তারা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করেছিলেন বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর। এরপর জামায়াত প্রার্থী এমপি নির্বাচতি হয়ে বিএনপির উপকারের পরিবর্তে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। চার দলীয় জোট ক্ষমতায় থাকলেও বিএনপির ২৩ নেতাকর্মী খুন, দুই শতাধিক আহত ও পঙ্গু, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে নানানভাবে আর্থিক ক্ষেত্রে লাভবান হয়েছে জামায়াত। যে কারণে এবারের ভোটে তারা ধানের শীষ প্রতীক জামায়াতের হাতে তুলে দিতে নারাজ। আমার বিশ্বাস জোট যোগ্য প্রার্থী হিসেবে আমাকেই চুড়ান্ত মনোনয়ন দেবে।
খুলনা-৬ আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ শাহ মুহম্মদ রুহুল কুদ্দুস বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আ’লীগের এড. সোহরাব আলী সানা নির্বাচত হন। তার কাছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস পরাজিত হন। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হন আ’লীগের এড. নুরুল হক। এবার আওয়ামীলীগের টিকেট পান নি এড. নুরুল হক। পেয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ ও বর্তমান আওয়ামীলীগ নেতা আক্তারুজ্জামান বাবু। আর মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টির শফিকুল ইসলাম মধুও এ আসনটির দাবিদার। অন্যদিকে বিএনপি’র জেলা সভাপতি এড. শফিকুল আলম মনা ও মহানগর জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দু’জনেই ২০ দলীয় জোট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। শফিকুল আলম মনা মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় তিনি আপীল করেছেন। এসএম শফিকুল আলম মনার ৫টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ২০টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন।
খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে মহানগর জামায়াতের আমীর আবুল কালাম আজাদ কামিল পাস। মালামাল সরবরাহ ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করেন। দায় দেনা রয়েছে ১২ লাখ টাকা। বার্ষিক আয় ব্যবসা থেকে ৩ লাখ টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ২৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকার।
জেলা বিএনপির সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনা। তিনি এলএলবি পাস হলেও ঠিকাদারি ব্যবসা করেন। বার্ষিক আয় ব্যবসা থেকে ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে রয়েছে ৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা এবং ঢাকার পূর্বাচলে এক খন্ড জমি আছে তার।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, তার মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় তিনি আপীল করেছেন। তার বিশ্বাস প্রার্থীতা ফিরে পাবেন তিনি। তিনি বলেন, সাংগঠনিকভাবে এ আসনে বিএনপি শক্ত ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে আছে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা নাশকতাসহ নানা অভিযোগে দলটির তৃণমূল বিপর্যন্ত হয়ে পড়ায় সাংগঠনিকভাবে তারা দূর্বল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়া অসম্ভব। ফলে জোট আমাকেই চুড়ান্ত প্রার্থী দেবে।
এদিকে গত ২ ডিসেম্বর কেডি ঘোষ রোডস্থ বিএনপি কার্যলয়ে বিএনপির ডুমুুরিয়া ও কয়রা উপজেলা বিএনপির তৃণমুল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা পৃথক পৃথকভাবে বৈঠক করে খুলনা-৫ ও ৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের বয়কট করে বিএনপির প্রার্থীদেরকে চুড়ান্ত ঘোণনার দাবি জানায়। সভায় বলা হয়- তাদের দাবি মানা না হলে বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা কঠোরতর কর্মসূচি, এমনকি ধানের শীষ প্রতীক নেয়া বহিরাগতদেরকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে। ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপির সভায় সভাপতিত্ব করেন খান আলী মুনসুর। কয়রা উপজেলা বিএনপির সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট মোমরেজুল ইসলাম।
এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহানগর সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, ঐতিহাসিক প্রয়োজনে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছি। কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা যাকে চুড়ান্ত প্রার্থী দেবে আমরা তার পক্ষেই কাজ করবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here