অরিত্রীর মৃত্যু জাতিকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে

0
14

অরিত্রী অধিকারী ‘মরিয়া প্রমাণ করিল’ দেশে শিক্ষাব্যবস্থা ঘুণে ধরা এবং এর আমূল পরিবর্তন দরকার। এ মৃত্যু অনাকাক্সিক্ষত। একজন শিক্ষার্থী কতটা অপমাণিত হলে আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে, শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষার জন্য স্কুলে যায়, লাশ হয়ে ঘরে ফেরার জন্য নয়? অরিত্রীর আত্মহত্যা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। অরিত্রী মরে নিজের লজ্জা ঢাকতে চেয়েছে, কিন্তু তার মৃত্যু জাতিকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।
অরিত্রীর বাবা-মাকে স্কুল ডেকেছিল, মেয়েকে সঙ্গে নিয়েই তারা স্কুলে যান। সেখানে এমন কিছু ঘটেছে যে, একটি পঞ্চদশী নাবালিকা বাবা-মা ঘরে ফেরার আগেই বাড়ি এসে আত্মহত্যা করে। নিজের বা বাবার অপমান কি এতটাই অসহ্য ছিল যে, তাকে রাগে-অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হলো? সেখানে ঠিক কি ঘটেছিল, জানা দরকার। স্কুলের অধ্যক্ষ বা সংশ্লিষ্টরা এর দায় এড়াতে পারেন না? অরিত্রী আত্মহত্যা করেনি, তাকে আত্মহননে প্ররোচিত করা হয়েছে।
একদা আমি ঢাকায় প্রায় এক যুগ ঢাকার একটি কলেজে মাস্টারি করেছি। সেই সুবাদে ভিকারুননিসা কলেজ সেকশনে দুয়েকবার এক্সটারনাল হিসেবে গিয়েছিলাম। তখনো তাদের কিছুটা উন্মাষিকতা ছিল। তখনো ভাবতাম, স্কুলটার নাম এমন কেন? পাকিস্তানের এক প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খাঁন নূনের স্ত্রীর নামে এই স্কুল। দেশ স্বাধীন হয়েছে, দৈনিক পাকিস্তান হয়েছে দৈনিক বাংলা, পাক মোটর হয়েছে বাংলা মোটর, কিন্তু স্কুলের নামটি পরিবর্তন হয়নি, কেন?
হাইকোর্ট ভিকারুননিসা স্কুলের ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে হৃদয়বিদারক বলে বর্ণনা করেছেন। রিট হয়েছে। অরিত্রীর বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। স্বজনরা বলছেন, স্কুলের শিক্ষকদের কাছে বাবার অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে অরিত্রী। শিক্ষকদের দাবি, বাবার অপমান নয়, পরীক্ষায় নকল করে ধরা পড়ে লজ্জায় এ ঘটনা ঘটিয়েছে অরিত্রী। ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী স্কুলে যান এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তোপের মুখে পড়েন।
এ ঘটনায় অধ্যক্ষ হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছেন। বলা হচ্ছে, অরিত্রী ও তার বাবা অধ্যক্ষের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি ক্ষমা করেননি। বরং পরদিন গিয়ে টিসি নেয়ার পরামর্শ দেন? অধ্যক্ষ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন তা বলাবাহুল্য। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির যেই সদস্য ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন, তিনি কে এবং তার ভূমিকা জানা দরকার। ধরে নেয়া যাক, অরিত্রী নকল করছিল, কিন্তু এর শাস্তি তো মৃত্যু হতে পারে না? স্কুল তো বাঁচতে শেখায়, মরতে না? অধ্যক্ষের ক্ষমা প্রার্থনা যথার্থ। কিন্তু তিনি একটি বালিকাকে করতে পারেননি, সেখানে জাতি তাকে ক্ষমা করে কীভাবে? অথচ স্কুলের একটু ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি একটি বালিকাকে বাঁচাতে পারত। অরিত্রীর আত্মহত্যার দায় কিছুটা মা-বাবাকেও নিতে হবে? চরম অপমানের পর মেয়েকে একা বাসায় যেতে দেয়াটা ঠিক হয়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষ অরিত্রীর ক্ষেত্রে ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। অধ্যক্ষ অরিত্রীকে টিসি দিতে পারেননি, বরং অরিত্রী সমাজকে টিসি দিয়ে চলে গেছে।
অরিত্রীর বাবা স্কুলে অপমানে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিশ্চয় স্কুলে আরো কিছু ঘটেছে তা বাবাকে কাঁদায়, মেয়েকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়? স্কুলের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মেয়ের সামনেই তার বাবাকে অপমান করেন। এ সময় একজন বলে ওঠেন, ‘এই পাগল-ছাগলের বাচ্চা, তোরে যে কইছি তুই শুনছ নাই’? ইহা কি সত্য? এটি কি চরম অবজ্ঞা নয়? এটি একজন শিক্ষিকার উক্তি? নাকি ভিকারুননিসার শিক্ষকরা নিজেদের অন্য গ্রহের বাসিন্দা মনে করেন? এ জন্যই হয়তো হাইকোর্ট বলেছেন, শিক্ষকদেরও মানসিক কাউন্সেলিং দরকার।
হাইকোর্টে রিট হয়েছে। কোর্ট একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্কুল তদন্ত করছে। তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। কেউ কেউ এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাÐ বলতে চাচ্ছেন এবং অধ্যক্ষকে ‘খুনি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছেন। স্কুলের ছাত্রীরা এবং অভিভাবকরা বিক্ষোভ করছেন। কেউবা এটিকে ক্ষমতার দাপট হিসেবে দেখতে চাইছেন। যে যাই বলুন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা চাই, শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে কিছুটা মানবিকতা না থাকলে শিক্ষা জীবন একজন মানুষের শ্রেষ্ঠ হয় কি করে? এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার। ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থী যেন আত্মহত্যা না করে তৎজন্যই এটি দরকার। অরিত্রী চলে গেছে, কোনো প্রতিকারই তাকে আর ফিরিয়ে আনবে না? তবু তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জীবন সুন্দর হোক, স্কুলে মানবতা বজায় থাকুক; শিক্ষার্থী জীবন হোক জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here